সঙ্কটের মুখে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত
আপলোড সময় :
১১-০৩-২০২৬ ১১:১৬:৫৭ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
১১-০৩-২০২৬ ১১:১৬:৫৭ পূর্বাহ্ন
সঙ্কটের মুখে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত
নিজস্ব প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির অস্থিরতা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের ওপর অশনিসংকেত নিয়ে আসছে। জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম এবং প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন রপ্তানি আদেশের গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধের এই উত্তাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য খাতের রপ্তানি আয় বড় ধরণের ধাক্কা খেতে পারে।
ভোক্তা বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রয়াদেশের পতন
ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় বাজারগুলোতে উচ্চ জ্বালানি খরচের কারণে খাদ্যদ্রব্য ও যাতায়াত ব্যয়ের পেছনে পরিবারগুলোকে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, ভোক্তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যয় মেটাতে গিয়ে পোশাকের মতো 'অ-প্রয়োজনীয়' পণ্যের বাজেট কমিয়ে দিচ্ছেন। ফলে বিদেশি ক্রেতারা তাদের অর্ডার পরিকল্পনা স্থগিত করছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান অর্ডারও বাতিল করছেন। জাতীয় নির্বাচনের পর স্থিতিশীলতার আশায় থাকা রপ্তানিকারকদের সেই প্রত্যাশা এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে ধূসর হতে চলেছে।
পোশাক খাতের বাইরেও উদ্বেগের বিস্তার
রপ্তানির এই মন্দাভাব কেবল তৈরি পোশাক খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে পাটজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পেও। পাটভিত্তিক লাইফস্টাইল পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ক্রিয়েশনস প্রাইভেট লিমিটেড’ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মেলায় আলোচনার পর নতুন অর্ডার আসার কথা থাকলেও যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ক্রেতারা সব ধরনের আলোচনা স্থগিত করেছেন। একইভাবে, পাদুকা খাতের উদ্যোক্তারাও এপ্রিলের সম্ভাব্য ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন।
সরবরাহ শৃঙ্খলে জটিলতা ও বাড়তি ব্যয়
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচল পথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শিপিং খরচ ও সময় উভয়ই বেড়ে গেছে। তেলের দাম বাড়ার ফলে কৃত্রিম সুতা ও কাপড়ের উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম ফিরোজের মতে, ক্রেতারা সরাসরি নেতিবাচক সংকেত না দিলেও ভোক্তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় পোশাকের অবস্থান নিচে নেমে যাওয়াটা বড় চিন্তার বিষয়।
আভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ঝুঁকি
বৈশ্বিক সমস্যার পাশাপাশি দেশেও ডিজেলে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদনের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় এবং লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক কারখানা জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। বিকেএমইএ এবং বিজিএমইএ-এর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, অনেক কারখানা বর্তমানে প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছে না। এই সংকট নিরসনে শিল্পের জন্য বিশেষ কোটা বরাদ্দের দাবি জানিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
চলমান রপ্তানি মন্দা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাস ধরেই বাংলাদেশের রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি ৩.১৫ শতাংশ কমেছে এবং শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই এই পতনের হার ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক সতর্ক করে বলেছেন, আমদানিকারক দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা আরও কমবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটলে ব্যবসা করার খরচ আরও বাড়বে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : NewsUpload
কমেন্ট বক্স